More
    Home Lead News রাজমিস্ত্রীর কাজ করে পাঠাগারঃ বাড়ী-বাড়ী বই পৌঁছে দিচ্ছে আতিফ

    রাজমিস্ত্রীর কাজ করে পাঠাগারঃ বাড়ী-বাড়ী বই পৌঁছে দিচ্ছে আতিফ

    মো.উমর ফারুক : কুড়ি বছরের স্বপ্নবাজ ছেলেটির নাম মোহাম্মদ আতিফ আসাদ। জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ীর ডোয়াইল ইউনিয়নে বেড়ে উঠা । দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া আতিফ ছোট বেলা থেকেই ছিলো মেধাবী এবং বইপ্রেমী। ছোট্ট থেকেই স্বপ্ন দেখতো একদিন স্ব-শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে অনেক বড় কিছু করবে। কিন্তু দরিদ্রতা নামক বেড়াজাল তাকে আটকে দিয়েছে বারংবার ।

    জীবনের নানা জঞ্জালে আটকে গিয়েছিলো জীবনটা। কিন্তু মেধাবী ও বিচক্ষণ আতিফ দমে যাননি। স্কুল বন্ধ থাকাকালীন কখনও রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, কিংবা ধানকাটার কাজ করে নিজের পড়াশোনা সাথে ধরেছে সংসারের হালও । টাকার অভাবে ঠিকমত টিউশন কিংবা বই কিনতে পারতো না। ঠিকমত যেতে পারতো না স্কুলে। তার পণ ছিলো যত প্রতিবন্ধকতাই আসুক না কেনও লেখাপড়া করবেই। তার অক্লান্ত পরিশ্রম ও অধ্যবসায় তাকে পেছনে তাকাতে দেয়নি। নানা প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে বর্তমানে জামালপুরের আশেক মাহমুদ কলেজে অধ্যয়ন করছে আতিফ।

    ২০১৮ সালের শুরুর দিকে স্বপ্নবাজ আতিফের ভাবনায় এলো দারুণ এক আইডিয়া। ছোট বেলা থেকে অভাব-অনটন, স্কুলে যেতে না পারা, বই কিনতে না পারা, ভালো শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে না পারার একটা আক্ষেপ। চিন্তা করলো এসময়ে হতদরিদ্র শিক্ষার্থী যারা টাকার অভাবে বই কিনতে পারছে না তাদের জন্য কিছু করবে। যেহেতু প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সবার টাকা দিয়ে বই কেনার সামর্থ্য নেই। যেখানে লেখাপড়ার খরচই যোগাতে পারে না। যদি গ্রামে একটা পাঠাগারের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে তার মত কেও টাকার অভাবে বই পড়া থেকে বঞ্চিত হবে না।

    বড় ভাই মিলনের পরামর্শ ও সহযোগিতা নিয়ে ২০১৮ সালের শুরুতে ২০টি বই নিয়ে নিজের বাড়ীতেই গড়ে তুলে ছোট্ট পাঠাগার। পরিকল্পনা মতো এগিয়ে যাচ্ছিলো আতিফ কিন্তু তাকে সবসময় পাশে থাকা ভাইটি হঠাৎই মারা যান।  আতিফ তখন একা হয়ে পড়েন কিন্তু থেমে যাননি। বর্তমানে আতিফের গড়া পাঠাগারে গ্রামের শিক্ষার্থীরা এখান থেকে বই নিয়ে পড়তে পারে।

    যারা পাঠাগারে আসতে পারে না তাদের জন্য আতিফ সাইকেল চালিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বাড়ী-বাড়ী গিয়ে হাতে বই দিয়ে আসে। বিনিময়ে নেয়না কোন পারিশ্রমিক। গ্রামে সবাই তাকে বইয়ের ফেরিওয়ালা বলেই ডাকে। ধীরে- ধীরে নানা পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা আতিফের পাঠাগারটি জায়গা করে নিয়েছে পাঠকদের। বর্তমানে পাঠাগারে রয়েছে প্রায় আড়াই হাজার বই।

    স্বপ্নবাজ তরুণ আতিফ পাঠাগার চালুর বিষয়ে বলেন, ”আমি নতুন একটি সমাজের কথা ভাবি, যেখানে কোন দরিদ্রতার কারণে কারো পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে না। টাকার অভাবে বই কিনে পড়া থেকে বঞ্চিত হবেনা। আমার মত কেও যেনও এত প্রতিবন্ধকতা না পড়ে। তাই দরিদ্র পরিবারে শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে একটি ছোট্ট পাঠাগার তৈরি চিন্তা করলাম। বড় ভাই মিলনকে সাথে নিয়ে প্রাথমিক অবস্থায় বারান্দায় পাটের-আটি দিয়ে একটা ছোট্ট রুম করে সেখানে ২০টি বই দিয়ে পাঠাগারের যাত্রা শুরু করলাম। আমি বিশ্বাস করতাম ভালো কাজে অবশ্যই সকলেই সহযোগিতা করবে। যে ভাই আমাকে সবক্ষণ পাশে থেকে সার্পোট করতো সেই ভাইটি কিছুদিন পর মারা গেলেন। আমি তার স্মৃতি প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পাঠাগারের নাম দিলাম “মিলন স্মৃতি পাঠাগার”।
    পরবর্তী সময়ে এলাকার বিত্তবান ও পরিচিত অনেকের সহযোগিতায় পাঠাগারের জন্য বই কিনে দিতে লাগলো। পাঠাগারে ভেতরে বই রাখার মতো কোন অবস্থা ছিলো না। ঠিক সেই সময়ে গ্যাসটন ব্যাটারীজ লিমিটেড এর নির্বাহী পরিচালক,কে. এইচ. মালেক সাহেবকে পাঠাগারের সমস্যার বিষয়টি অবহিত করলে বাংলা সাহিত্যের সেরা শতাধিক বই দিলেন। সাথে বই রাখার জন্য একটি আলমারীও কিনে দিলেন।২০টি  বই দিয়ে যাত্রা শুরু করা পাঠাগারে এখন প্রায় হাজার খানেক বিভিন্ন ক্যাটাগরির বই সংগৃহীত রয়েছে।”

    সাইকেল চালিয়ে মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে পাঠকদের বাড়ীতে বই পৌঁছে দেয়ার বিষয়ে আসিফ বলেন, আমি প্রতি সপ্তাহে আমার গ্রামের বাড়ীতে-বাড়ীতে গিয়ে বই দিয়ে আসি। পরের সপ্তাহে সেগুলো আবার ফিরিয়ে আনি,নতুন বই দিয়ে আসি।কেউ ১০-১৫ কিলোমিটার দূর থেকেও ফোন করলে সাইকেল দিয়ে বাড়ীতে গিয়ে বই দিয়ে আসি। এখন আমার এই কর্ম দেখে দেশের কয়েকটি জায়গায় পাঠাগার গড়ে তুলছেন। এছাড়াও অনেকে পাঠাগার করবেন বলে আমাকে জানাচ্ছেন। এটাই আমার বড় পাওয়া। আমি প্রত্যেকটি গ্রামে একটি করে পাঠাগার হোক।

    পাঠাগার নিয়ে প্রতিবন্ধকতা বিষয়টি উল্লেখ করে আসাদ জানায়, গ্রামে যখন এ ধরনের পাঠাগার চালু করা হয়েছিলো তখন এলাকার মানুষ নানা নেতিবাচক কথা বলতো। এই সময় ভালো করে লেখাপড়া না করে বই বিলিয়ে বেড়ায়। খেয়ে দেয়ে কাজ নেই। সহযোগিতার বদলে অবজ্ঞা করতো। কিন্তু তাদের কথা কানে নিতাম না। সবচেয়ে বড় সমস্যা পাঠাগারটি বাড়ীতে হওয়ায় সবাই পাঠাগারে বসে পড়তে পারেন না। পাঠাগারটি একটা নিজস্ব জায়গায় দাড়াতে পারলে সবাই এখানে বসে বই পড়তে পারতো।সামাজিক কাজ গুলো পাঠাগারে বসে করতো পারতো।যদি কারও সহযোগিতা পাই তাহলে ইনশাআল্লাহ একটা নিজস্ব জায়গায় পাঠাগার দাড় করাবো।যাতে সবাই এখানে এসে বই পড়তে পারে বসে।

    আসিফ তার পাঠাগার নিয়ে তার দু চোখ ভরা স্বপ্নের কথা জানালেন। আর বললেন,আমি স্বপ্ন দেখি প্রত্যেকটি গ্রামে একটি করে পাঠাগার গড়ে উঠুক । বই পড়ার আন্দোলন আমার গ্রাম শুধু নয় সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ুক।সারা বাংলাদেশে বই পড়ার নতুন জাগরণ সৃষ্টি হোক।লেখাপড়া শেষ করে যেই পেশায় কাজ করি না কেন,আমি যেই গ্রামেই থাকি,সেখানেও আমি চাকরির পাশাপাশি পাঠাগার করে বই নিয়ে বেড়িয়ে পড়বো।  পরিশেষে মানুষের প্রতি অনুরোধ থাকবে আপনারা সবাই পড়ুন,প্রিয়জনকে বই উপহার দিন। একাডেমীক বইগুলো শুধু যোগ্যতার জন্য। পৃথিবীকে জানতে হলে চারিদিকের সব তথ্য জানতে গেলে,একজন ভালো মানুষ হতে গেলেও বই পড়ার বিকল্প নেই।

    এভাবের নিত্যাদিন পাঠাগার নিয়ে স্বপ্ন বু্ঁনছে তরুণ আতিফ। অর্থাভাবে বই কিনে পড়ার সামর্থ্য রাখে না তাদের একটি ফোন কল পেয়েই সাইকেল নিয়ে ছুঁটে যান বই নিয়ে। পাঠাগারের খরচের চালাতে আতিফের করতে হয় রাজমিস্ত্রী, রডমিস্ত্রির কাজ । তাছাড়া বিভিন্ন সময় বিত্তবান লোকদের আর্থিক সহযোগিতা পাশাপাশি পাঠাগারের জন্য কিনে দেন বই। এভাবেই চলছে ভাইয়ের নামে করা পাঠাগারটি। বৃত্তবান লোকদের সার্বিক সহযোগিতা পেলে আরো ভালো ভাবে পাঠকদের কাছে বই পৌঁছে দিতে পারবে এমনটাই আশাবাদী আতিফ। পাঠাগারে বসার জায়গা না থাকায় বাড়ী-বাড়ী বই পৌঁছে দিয়ে এলাকাতে বইয়ের ফেরিওয়ালা নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে এই স্বপ্নবাজ বালকটি।

    Most Popular

    ‘আমি সুস্থ, আপাতত বিশ্রামে থাকব’, করোনা জয় করে বললেন দিলীপ ঘোষ

    কলকাতা, ২১ অক্টোবর- করোনাকে (Coronavirus) হারিয়ে বাড়ি ফিরলেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh)। মঙ্গলবার সকালেই হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া...

    শিবচর উপজেলার উপ-নির্বাচনে আ.লীগ প্রার্থীর বিজয়

    মাদারীপুর, ২০ অক্টোবর- মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদে উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আব্দুল লতিফ মোল্লা ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬৩৩...

    আইপিএলে টানা দুই সেঞ্চুরিতে ইতিহাস ধাওয়ানের

    আবুধাবি, ২০ অক্টোবর- টানা দু’টি ম্যাচে সেঞ্চুরি৷ আইপিএলের ইতিহাসে প্রথমবার৷ আগের ম্যাচে সেঞ্চুরি করে চেন্নাই সুপার কিংসের বিরুদ্ধে দলকে জিতিয়েছিলেন দিল্লি...

    পুঠিয়ায় এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার পরিবারের দাবি পরিকল্পিত হত্যা

    মুস্তাফিজুর পুঠিয়া প্রতিনিধিঃ রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ভালুকগাছী ইউনিয়নের নওপাড়া গ্রামের একাডেমীর পিছনে ধান ক্ষেতের পার্শ্বে আম বাগান থেকে ওইর বক্স (৫০) নামে দুই পায়ের...