More
    Home কলাম বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের নেপথ্য

    বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের নেপথ্য

    সোহেল রানা : পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন। দেশটিকে বলা হয় পৃথিবীর কারখানা। দেশটি বর্তমান নেতৃত্ব স্বপ্ন দেখছে ২০৫০ সালে মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র হটিয়ে পৃথিবীর মোড়লত্বের আসনে বসতে। এ লক্ষে আগ্রসী বিনিয়োগ নীতিতে এগিয়ে চলেছে দেশটি ।
    চীন এই আগ্রাসী বিনিয়োগ নীতির মাধ্যমে কৌশলে বিভিন্নদেশকে নিজের বলয়ে রাখার চেষ্টা করছে। চীনের এই বিনিয়োগ নীতির কারণেই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে দ্রুত পট পরিবর্তন হচ্ছে,পালটে যাচ্ছে ভূরাজনৈতিক কৌশলও। এ এলাকায় ক্রমেই বাড়ছে চীনে আধিপত্য।
    ভারতে সাথে বাড়ছে বৈরিতা। চীন ও ভারতের এই বৈরিতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ লাভবান হতে পারে। এজন্য প্রয়োজন ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং কৌশলি পদক্ষেপ। বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত বাংলাদেশের যেমন রয়েছে ভূরাজনৈতিক কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। তেমনি পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ অনেক বড় বাজারও বটে।
    এশিয়ার দুই অন্যতম পরাশক্তি ভারত-চীন কৌশলগত উপায়ে বাংলাদেশকে নিজ ব্লকে রাখতে চায়। এজন্য তারা এদেশে বিপুল বিনিয়োগে আগ্রহী । বাংলাদেশ তাদের এই প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতিকে যেমন চাঙ্গা করতে পারে তেমনি জনসাধারনের জীবন মানও উন্নত করতে পারে। চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার।
    অন্যদিকে বাংলাদেশও দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের তৃতীয় বৃহত্তম অংশীদার। চীন ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ২০০০ সালের ৯০ কোটি মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ২০১৫ সালে ১৪৭০ কোটি ডলারে পরিণত হয়। এক্ষেত্রে বার্ষিক বৃদ্ধির হার প্রায় ২০ শতাংশ। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের স্বপ্নের পদ্মা সেতু, পায়রা বন্দর নির্মাণসহ নানা অবকাঠামো প্রকল্পের সাথে জড়িত।
    এছাড়াও চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ, চট্টগ্রাম এবং খুলনায় দুটি বড় তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের সাথেও চীন সম্পৃক্ত আছে। চীন ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি সর্বাধুনিক নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।
    এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শাহজালাল সার কারখানা ও বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্র। পরিবহন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও টেলিযোগাযোগসহ নানা ক্ষেত্রে চীনের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো জড়িত আছে। চীনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক প্রথম দফায় যেসব প্রকল্পে ঋণ দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্পও রয়েছে।
    চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যোগদানের পর থেকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাড়ছেই । বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০১৯ সালে দেশে ২৮৭ কোটি ডলারের বিনিয়োগ আসে। যার মধ্যে চীন থেকে আসে সবচেয়ে বেশি ৬৩ কোটি ডলার, যা মোট বিনিয়োগের প্রায় ২২ শতাংশ। করোনা ভাইরাসে যখন স্থবির বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে চীন।
    সম্প্রতি চীনা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দুটি সুখবর দিয়েছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ ( বেজা) । প্রথমটি চীনের ইয়াবাং ইনভেস্টিমেন্ট হোল্ডিংস ৩০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে ১০০ একর জমি নিচ্ছে। এই গ্রুপটি চীনের জিয়াংসু স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকা ভুক্ত সংস্থা। এজন্য তারা টাকাও জমা দিয়েছে।
    ঈদুল আজহার পর তাদের সাথে চুক্তি হবে বলে জানিয়েছে বেজা। ইয়াবাং ১০০ একর জমিতে বস্ত্রখাতের রাসায়নিক, ঔষুদের কাঁচামাল, অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট ( এপিআর) ও অন্যান্য রাসায়নিক উৎপাদন করবে। বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে তারা ১৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করতে চায়। আর ১০ কোটি ডলারের পণ্যে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করবে।
    এতে ২ হাজার ২০০ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। অন্যদিকে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বিনিয়োগ করতে চায় চায়না হারবারও। সাম্প্রতি বেজাকে দেয়া এক চিঠিতে তারা জানিয়েছে ৬০ টি চীনা কোম্পানি বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে তাদের কাছে।
    এতে যে জমি লাগবে তা চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রায় ৪০ শতাংশ। তারা আশা করছে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ আসতে পারে। এতে কাজ পাবে ৬০ থেকে ৯০ হাজার মানুষ। এছাড়াও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমরাস্ত্র সরবরাহকারী দেশ চীন।
    চীন যত সমরাস্ত্র রফতানি করে তার ২০ ভাগই কেনে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে উপরে আছে শুধু পাকিস্তান। এদেশে মেরিটাইম পেট্রাল ভেসেল, সাবমেরিন, জঙ্গিবিমান, ট্যাংক, জাহাজ বিধ্বংসী ও ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করে থাকে চীন।
    সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণেও চীনের প্রবল আগ্রহ ছিল। কিন্তু ভারতের অব্যাহত বিরোধিতায় শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন চীনে শ্রমিকদের ক্রমাগত বেতন বৃদ্ধি ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে চীনা কোম্পানির বাংলাদেশে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হয়েছে। চীনে এখন বেতন বেড়েই চলেছে। চীনের বেইজিং, সাংহাই, গুয়াংডং, জেজিয়াংসহ অনেক এলাকায় ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০০ ডলার বা ২৫ হাজার টাকার বেশি। আর বাংলাদেশে এটা ১০০ ডলার বা আট হাজার টাকার মত। মানে চীনের এক তৃতীয়াংশ। ভিয়েতনামেও নুন্যতম বেতন ২০০ ডলার।
    ফলে চীনে পণ্য উৎপাদন ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। ফলে চীনা উদ্যোক্তারা এখন অন্য দেশে কারখানা স্থাপনের চেষ্টা করছেন। তাদের অগ্রাধিকার তালিকায় আছে এমন দেশ যেখান থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় চীনসহ বিভিন্ন দেশে পন্য রফতানি করা যায়। এক্ষেত্রে তাদের পছন্দের তালিকায় আছে বাংলাদেশ। যেমন সনি মোবাইল ও স্যামসাংয়ে মত কোম্পানি চীন থেকে সরে যাচ্ছে।
    বিশেষজ্ঞার বলছেন, চীনাদের বিনিয়োগ পেতে হলে দ্রুত তাদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ শেষ করতে হবে। শুধু পোশাক রফতানি নির্ভরতা কাটিয়ে পণ্য বহুমুখীকরণ করতে হবে। তাহলেই চীনের শুল্কমুক্ত সুবিধা কাজে লাগানো যাবে। বাংলাদেশের অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন চীনের কাছ থেকেই বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে বেশি লাভবান হতে পারে।
    লাদাখে চীনা সেনাদের হামলায় ভারতের শতাধিক সেনা হতাহত হওয়ার পরপরই চীন বাংলাদেশে তিন হাজারের বেশি বাংলাদেশি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে। করোনারভাইরাস মহামারির এই কঠিন সময়ে বাংলাদেশের জন্য এটা দারুণ সুখবরর। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজারে এখন সব মিলিয়ে ৮২৫৬টি পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে।
    ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সফরে এসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এক নিবন্ধে লিখেছিলেন, চীন ও বাংলাদেশের জনগণের প্রাচীনকাল থেকেই পরস্পরের ভালো বন্ধু ও প্রতিবেশি। প্রাচীনকালের দক্ষিণের রেশমপথ এবং সামুদ্রিক রেশমপথ ছিল দুদেশের যোগাযোগের মুল মাধ্যম।
    এনিয়ে হাজার বছর ধরে প্রচালিত অনেক-গল্প- কাহিনীও রয়েছে। চীনের ফাহিয়েন ও হিউয়েন সাং বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের সন্ধানে এ অঞ্চলে এসেছিলেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের অতীশ দীপক্কর চীনে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেছেন। চীনের মিং রাজবংশ আমলের সমুদ্রচারী চাং হো’ও দুবার বাংলা সফর করেন।
    তিনি লিখেছিলেন এ অঞ্চলের রীতিনীতি সরল এলাকাটি জনবহুল ও শস্য সমৃদ্ধ। বঙ্গদেশের তৎকালীন রাজা চীনের মিং রাজবংশ আমলের সম্রাটকে একটি জিরাফ উপহার দিয়েছিলেন। তখন এই জিরাফ চীনে ‘ চীনা ড্রাগন ছিলিন ‘ নামে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
    চীন বাংলাদেশের মৈত্রী ইতিহাসও দীর্ঘ। গতশতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তৎকালীন চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই দুবার ঢাকা সফর করেন। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও সেসময় দুবার চীন সফর করেন। চীন- বাংলাদেশ কুটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার অনেক আগেই দুদেশের প্রবীণ নেতৃবৃন্দ মেত্রীবৃক্ষের চারাটি রোপণ করেছিলেন।
    আজ সেই বৃক্ষ অনেক বড় হয়েছে,যার শিকর অনেক গভীরে প্রতীত।এই বৃক্ষের ফলও দুদেশের জনগণ পেয়েছে এবং পাচ্ছে। চীনা প্রেসিডেন্টের এই সফরের পর থেকেই চীন- বাংলাদেশের সম্পর্ক যেমন অব্যাহত ভাবে বাড়ছে। তেমনি বাণিজ্যিক, সামরিক সম্পর্কও শক্তিশালি হচ্ছে । চীনের সাথে বাংলাদেশের এই সম্পর্ক ভালোভাবে দেখছে না ভারত। তাদের আশঙ্কা বাংলাদেশ আস্তে আস্তে চীনা ঘেঁষা হয়ে যাচ্ছে।
    যা তাদের নিরাপত্তা দিক থেকে হুমকিস্বরুপ, অন্যদিকে চীন থেকে যেসব কারখানা সরে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করছে, সেগুলোকে নিজ দেশে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকেও প্রতিপক্ষ ভাবছে তারা। ভারত ও চীন উভয় দেশই আমাদের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার।
    তারা আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে অনেক অর্থ বিনিয়োগ করে থাকে। তাই কারোপ্রতি বিশেষ দূর্বলতা না দেখিয়ে বাংলাদেশকে কৌশলে ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক রেখে উভয় দেশের বিনিয়োগকে কাজে লাগিয়ে দেশকে সমৃদ্ধশালি করতে হবে।
    লেখক- শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

    Most Popular

    সৌমিত্রের ডায়ালিসিস শিগগিরই – DesheBideshe

    কলকাতা, ২৯ অক্টোবর- রেনাল রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি দেওয়া হচ্ছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে সম্প্রতি এমনটাই তথ্য প্রকাশ করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো। জানা গেছে- থেরাপি শুরুর...

    শার্শায় ইজিবাইকসহ ফেনসিডিল জব্দ, আটক-১

    সোহেল রানা, যশোর প্রতিনিধিঃযশোরের শার্শায় ৭০ বোতল ফেনসিডিলসহ নাজিম উদ্দিন (২১) নামে এক মাদক পাচারকারীকে আটক করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় একটি ইজিবাইক জব্দ করা...

    কবি সফিক আলম মেহেদী ও সঙ্গীত শিল্পীর শিরিন আক্তার চন্দনার বিয়ে”

    হাকিকুল ইসলাম খোকন ,বাপসনিউজ, আইবিএন, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি :বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সিনিয়র সচিব ও কবি সফিক আলম মেহেদী এবং বিটিভির নন্দিত সঙ্গীত শিল্পী শিরিন আক্তার...

    গাইবান্ধায় ট্রেনের ধাক্কায় প্রান গেলে কলেজ পড়ুয়া যুবকের!

    সাকিব হাসান চৌধুরী সাম্য, গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি : আজ বুধবার (২৮ অক্টোবর) গাইবান্ধার রেললাইনে কানে হেডফোন দিয়ে হাটার সময় ট্রেনের ধাক্কায় প্রান গেল গাইবান্ধা...