More
    Home কলমেই মুক্তি প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিবন্ধকতায় করণীয় 

    প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিবন্ধকতায় করণীয় 

    জান্নাতুল মাওয়া নাজ : একটি শিশু ভবিষ্যতে কতটুকু ন্যায় নীতিবান, আদর্শবান, চরিত্রবান হবে কিংবা দেশ, জাতি, সমাজের প্রতি কতটুকু দায়িত্বশীল হবে এটি অনেকাংশেই নির্ভর করে তাঁর প্রাথমিক জীবনের শিক্ষার উপর। প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব তাই অপরিসীম। শিক্ষা এমন একটি অদৃশ্য শক্তি যা কেউ চাইলেও কেড়ে নিতে পারে না। আর এই অদৃশ্য শক্তির প্রাথমিক পর্ব হলো প্রাথমিক শিক্ষা।
    প্রাথমিক শিক্ষা আমাদের মৌলিক অধিকার। প্রাথমিক শিক্ষার নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। এখন সময় এসেছে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণের। মানসম্মত শিক্ষা বলতে বুঝায়-যে শিক্ষা শিক্ষার্থীর শিক্ষা স্তর অনুযায়ী জ্ঞানের বিকাশ ঘটায়, জ্ঞানকে বাস্তবে প্রয়োগ করে সমস্যা সমাধানের দক্ষতার উন্নয়ন ঘটায় এবং সমাজ কাঙ্খিত দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টিতে সহায়তা করে, তাকে মানসম্মত শিক্ষা বা কোয়ালিটি এডুকেশন বলে।
    প্রাথমিক শিক্ষা যদি মানসম্মত না হয়, তবে পরবর্তী শিক্ষাস্তর টেকসই হওয়ার কথা নয়। প্রাথমিক শিক্ষার স্তর বলতে ১ম শ্রেণি হতে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত বুঝায়। যদিও জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এ উল্লেখ রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা স্তর ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত এবং সে মোতাবেক বাস্তবায়নের কাজ চলছে।
    এছাড়াও প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি নামে বাংলাদেশের প্রত্যেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি বিশেষ শ্রেণি রয়েছে। এ শ্রেণিটি হচ্ছে ১ম শ্রেণিতে ভর্তিও প্রস্তুতি স্বরুপ। বিদ্যালয়ের সবচেয়ে আকর্ষনীয় কক্ষটি হচ্ছে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির জন্য বরাদ্দ।
    ১ম শ্রেণি থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত ২৯টি প্রাথমিক যোগ্যতা রয়েছে। এ যোগ্যতাগুলি প্রত্যেকটি শ্রেণিতে বিষয়ভিত্তিক ভাগ করা রয়েছে। একজন শিক্ষার্থী ১ম শ্রেণি হতে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন শেষ করে যদি ২৯টি প্রাথমিক যোগ্যতা সফলভাবে অর্জনের মধ্য দিয়ে বাস্তব জীবনে কাজে লাগাতে পারে।
    শিক্ষা যেমন সবার মৌলিক চাহিদা, তেমনি মৌলিক শিক্ষা অর্জনের মৌলিক ভিত্তি তৈরির স্থান হলো প্রাথমিক শিক্ষা। যা প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো থেকেই হাতেখড়ি হয়ে থাকে। যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত, সে জাতি তত বেশি উন্নত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন স্বাধীনতা পরবর্তী আমাদের এই ভক্সগুর দেশকে সমৃদ্ধির পথে নিতে হলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
    তাইতো শিক্ষার শিকড়ে হাত দিয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালে ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জাতীয়করণ করেন যা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে আমরা হাঁটিহাঁটি পা পা করে বর্তমান অগ্রগতির অবস্থানে রয়েছি।
    বর্তমান সরকারের সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে একই সঙ্গে ২৬ হাজার ১৯৩টি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজার।
    আমরা জানি, এক দশক আগেও বাংলাদেশে স্কুলগামী ছাত্র-ছাত্রীর হার ছিল খুব কম। মেয়েদের হার ছিল আরও কম। বর্তমান সরকারের নানামুখী পদক্ষেপে যেমন শতভাগ উপস্থিতি, অভিভাবকদের সচেতনতা, শিক্ষার্থীদেও পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা, সময়মত বই বিতরণ, বিনা বেতনে শিক্ষা, ফ্রি টিফিনের ব্যবস্থা, বাল্য বিবাহ রোধ, পোশাকের জন্য অর্থ বরাদ্দ প্রভৃতি কারণে স্কুলগামী ছেলেমেয়ের সংখ্যা যেমন বেড়েছে তেমনি শিক্ষার হারও প্রতি বছর বেড়েই চলেছে।
    বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় তাদের শিশু কিশোররা প্রাথমিক জীবনে যা অর্জন করে আমরা প্রাথমিক পর্যায়েও তা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। কারণ মূল ভিত্তি তৈরীর স্থান হলো প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা সেখানেই আমরা নয় ছয় দিয়ে পার করে তাদেরকে পরবর্তী জীবনকে ধবংস করে দিচ্ছি।
    পৃথিবীর সমৃদ্ধ দেশগুলোতে একজন কিশোর তার টিনেজ বয়স থেকে কর্মমূখী হয়ে নিজে স্বাবলম্বী হয় আর দেশের জন্য নিজেকে সর্ব্বোচ্চ প্রস্তুত করে রাখে। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষার  হার যত বাড়ছে বেকারত্ব ততই গ্রাস করছে। কর্মমূখী শিক্ষা থেকে দুরে তাদেরকে পুথিগত বিদ্যার ডুবিয়ে রেখে শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করে বেকারত্বের অভিশাপে বুকে  বয়ে বেরাতে হচ্ছে।
    প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় সরকার এত গুরুত্ব প্রদান করার পরেও নিম্নোক্ত সমস্যাসমূহ এখনো বিদ্যমান রয়েছে বলে আমি মনে করি।
    • উপযুক্ত দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষক ছাড়া শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের দেশে দক্ষ শিক্ষকের অভাব প্রকট। অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ শিক্ষার মান উন্নয়নকে চরমভাবে ব্যাহত করে। হরতাল, অবরোধ, ভাঙচুর বিদ্যালয় এবং শিক্ষার্থীদেরকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়।
    • শিক্ষা খাত অন্যতম দুর্নীতিগ্রত একটি খাত। দুর্নীতি এই খাতের উন্নতির বড় অšতরায়। অবকাঠামোগত সমস্যা শিক্ষার পরিমাণগত এবং গুণগত উভয় প্রকার উন্নয়নকে ব্যাহত করে। শিক্ষার উন্নয়নে দরকার সুষ্ঠু ও নিরবচ্ছিন্ন পরিকল্পনা। বাংলাদেশে এর যথেষ্ট অভাব লক্ষণীয়। বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থা যুগোপযোগী নয়।
    • প্রতি বছর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, জুনিয়র সমাপনী, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস এবং এ প্লাস প্রাপ্তদের সংখ্যা বাড়লেও মান বাড়ছে না। সার্বিক বিচারে শিক্ষা সময়ের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।
    • অভিভাবকদের ব্যাপক অসচেতনতা রয়েছে। অনেকের ধারণা, পড়ালেখা করে গরিব মানুষের সন্তানদের চাকরি পাওয়া কঠিন। তা ছাড়া শিক্ষার গুরুত্ব বা সুদূরপ্রসারী ফল নিয়ে চিন্তা করার মতো কল্পনাশক্তিও তাদের নেই। একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার জন্য যে জনবল প্রয়োজন সেই তুলনায় সংখ্যাটা অপ্রতুল।
    • শিশুদের নৈতিকতা শিক্ষা না দেয়া। শিক্ষকের অপ্রতুলতা /অপর্যাপ্ততা। আদর্শবান জাতি গঠনের লক্ষে সুস্থ মেধা বিকাশ উপযোগী যে ধরনের শ্রেণি কক্ষ দরকার তা অনেক বিদ্যালয়েই অনুপস্থিত। সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক বিদ্যালয়ে বসার বেঞ্চ নেই, খেলার সামগ্রী নেই। বাংলাদেশে এখনো অনেক পরিবার দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছে। ফলে তারা তাদেও সšতানদের বিদ্যালয়ের চেয়ে জীবন জীবিকার কাজে নিয়োজিত করতেই বেশি পছন্দ করে।
    • বাংলাদেশে এখনও অনেক পরিবার দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করছে। এসব পরিবারের মা-বাবারা মনে করেন তার সন্তান স্কুলে গিয়ে যে বৃত্তি পাবেন তার চেয়ে অনেক বেশি আয় করতে পারবে বাসাবাড়ী বা বাইরে অন্য কোথাও কাজ করে। ফলে তারা তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ের চেয়ে জীবন জীবিকার কাজে নিয়োজিত করতেই বেশি পছন্দ করে। শিক্ষার সুদুর প্রসারী ফলাফল সম্পর্কে তাদের ধারণাও একবারেই কম।
    প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে যে বিষয়ে যে যে পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি:
    • শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাবী, চরিত্রবান ও যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে হবে।
    • শুধু সিলেবাসভুক্ত পড়াশোনা না করিয়ে আদর্শভিত্তিক নীতি-নৈতিকতাস¤পন্ন মানসিকতা তৈরির পদক্ষেপ নিতে হবে।
    • চার বছর বয়সে স্কুলে গমন বাধ্যতামূলক করে ছয় বছর বয়স পর্যন্ত শুধু নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। ছয় বছর প্লাস হলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদান শুরু করতে হবে।
    • শিক্ষকদের পৃথক বেতন কাঠামো করে তাদের মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে হবে।
    • ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত কমিয়ে আনতে হবে।
    • শিক্ষার ব্যাপারে অভিভাবকদের আরও বেশি সচেতন করতে হবে।
    • প্রত্যেকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাসে অন্তত একদিন একজন সফল ব্যক্তিত্বকে দিয়ে ছাত্র ছাত্রীদেরকে ভবিষ্যৎ তৈরির জন্য স্বপ্ন দেখাতে হবে এবং জাতির ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে।
    • সর্বোপরি সুস্থ মেধা বিকাশে শিক্ষার পরিবেশ তৈরির জন্য যা যা প্রয়োজন সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য তা নিশ্চিত করতে হবে।
    • শুধু মুখস্থবিদ্যার দিকে মনোনিবেশ করার জন্য কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ না করা।
    • পর্যাপ্ত পরিমাণ খেলাধুলা ও বিদ্যালয়ে শিশুদের মনের মতো বিনোদনের ব্যবস্থা করা।
    • মাতৃপিতৃ মমতায় শিশুদের লালন করা।
    • বিদ্যালয়কে পরিপাটি ও পারিবারিক বাসস্থানের মতো শিশুবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা।
    • পাঠ্যপুস্তকের পাঠাপাশি নিয়ানুবর্তিতা শিক্ষার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করা।
    • শিক্ষক হিসেবে নিজেকে যোগ্যতম হিসেবে গড়ে তুলে শিক্ষা দান করা।
    • শিক্ষার ব্যাপারে অভিভাবকদের আরও বেশি সচেতন করার লক্ষ্যে নিয়মিত পিটিএ সভার আয়োজন করা।
    • মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করা।
    • প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক ও শিক্ষা খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা
    • মূল্যবোধ, নৈতিকতা, দেশপ্রেমযুক্ত আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন।

    পরিশেষে বলা যায়, একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সেগুলো অবশ্যই একদিন দূর হবে এবং জাতির পিতার যে স্বপ্ন সাধ নিয়ে এই জাতির পথ চলা শুরু হয়েছিল তা অচিরেই পূর্ণ হবে। কেবল সরকার করে দেবে এই আশায় না থেকে সামাজিক উদ্যোগ থেকেই এটা করা সম্ভব। আমরা পার¯পরিক শ্রদ্ধাবোধ, দায়িত্ববোধ এবং সেবাধর্মী একটি জাতি গঠনে সবাই কাজ করব। নীতি নৈতিকতা স¤পন্ন, দেশ প্রেম জাগ্রত করে কর্মমুখী হিসেবে গড়ে তুলতে প্রাথমিক ¯তর থেকে মুল ভিত্তি রচনা করে দিতে হবে।

    লেখক- শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

    Most Popular

    আশাশুনির তুয়ারডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এসএমসির সভা

    আহসান উল্লাহ বাবলু সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধিঃ আশাশুনির তুয়ারডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এসএমসি'র সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার সকালে তুয়ারডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত...

    চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে পূজা মন্ডপ পরিদর্শনে অতিরিক্ত ডিআইজি।

    সুমন পল্লব, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলা পূজা মন্ডপ পরিদর্শনে করেন চট্টগ্রাম রেন্জের পুলিশে অতিরিক্ত ডিআইজি মোঃজাকির হেসেন খাঁন । শনিবার ২৪অক্টোবর বিকেলে উপজেলা...

    গলায় ফাঁস দিয়ে এক শ্রমিকের আত্মহত্যা

    সুলতান আল একরাম,ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধিঃ ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলায় সলেমানপুরে শ্রী সুজন কুমার (৩৫) নামে এক শ্রমিকের গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যর ঘটনা ঘটেছে। (২৪ অক্টোবর) শনিবার...

    সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন উদ্বোধন করেন এমপি রবি

    আহসান উল্লাহ বাবলু সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধিঃ ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। শনিবার (২৪...