More
    Home কলমেই মুক্তি প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষিত অবস্থা

    প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষিত অবস্থা

    আলীনুর রহমান রানা : প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কে কিছু বলার আগে প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের সম্যক ধারনা থাকা দরকার। কোন রাষ্ট্র কিংবা সভ্যতার জন্যে তার নাগরিকদের প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা কেন জরুরী হবে তার কারন সম্পর্কে আগে স্পষ্ট হতে হবে। কারন, এই স্পষ্টতার অভাবেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরকারের গৃহীত বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জিত হচ্ছে না।

    মূলত রাষ্ট্র তার নিজের প্রয়োজনেই সকল নাগরিককে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা দিয়ে থাকে। কারন, এটা একটি দেশের জনগনের সাথে রাষ্ট্রের সব থেকে বড় গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ গুলোর মধ্যে অন্যতম। একটি যন্ত্রকে সফলতার সাথে পরিচালনার জন্যে সংশ্লিষ্টদের যেমন প্রশিক্ষণের দরকার হয় তেমনি রাষ্ট্রযন্ত্রকে কার্যকর ভাবে পরিচালনা করার জন্যে সাধারন জনগণের প্রাথমিক শিক্ষার কোন বিকল্প নেই।

    চরিত্র, মূল্যবোধ, চেতনা , দেশপ্রেম ইত্যাদি পরিভাষা গুলো একটি দেশের নাগরিকদের মধ্যে সুন্দরভাবে গড়ে ওঠা সেই জাতির উন্নয়নের জন্যে একটা অপরিহার্য দাবি। আর এই সমস্ত গুণাবলী অর্জনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাহ্যিক রুপ হল বিদ্যায়তনগুলো। এজন্যে প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য হতে হবে এই রাষ্ট্রযন্ত্র কে সফলতার সাথে পরিচালনা করার জন্যে জনগণের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মত যোগ্য এবং দক্ষ করে গড়ে তোলা। সেই জ্ঞান অর্জন করাতে গেলে দেশের অতীত ইতিহাস, কৃষ্টি- সংস্কৃতি, ভৌগলিক অবস্থান, সমাজ ব্যবস্থা, প্রযুক্তি, ধর্মীয় মূল্যবোধ – ইত্যাদি বিষয়গুলো আপনা আপনি চলে আসবে।

    আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার বিবর্তনগুলো একটু পর্যালোচনা করলে দেখতে পাবেন শিক্ষা পাঠ্যক্রমে বারংবার কমবেশি পরিবর্তন সাধিত হয়েছে যদিও শিক্ষা ব্যবস্থা আগের মত গতানুগতিক ধাঁচেই চলেছে এবং চলছে।

    প্রাথমিক কিংবা মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বাধ্যতামূলক সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির মত যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত প্রকৃত অর্থেই গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে বদলে দিতে সক্ষম হয়েছে কী না সেটাও ভাববার বিষয়। কারন গতানুগতিকতার ফসল হিসেবে নোট, শীট, গাইড কিংবা কোচিং এর ওপর শিক্ষার্থীদের নির্ভরতা কোন অংশে কমেছে বলে মনে হয়না।

    সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে আরো যেসব প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক শিক্ষায় নিয়োজিত রয়েছে সেখানকার চিত্র তো আরো ভয়াবহ। তাদের পাঠ্যক্রম গুলো দেখলে আপনার চোখ ছানাবড়া হতে বাধ্য। এইটুকু বয়সে যেসব কঠিন কঠিন শিক্ষা গলাধঃকরণ করানো হয়, আদৌ তার সাথে প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য মিলে কী না এটা একটা বড় প্রশ্ন হতে পারে। প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করতে এসে একটা বাচ্চা শিশুকে রীতিমত জ্ঞান-বিশারদ বানিয়ে ফেলার আয়োজন চলছে যেন!

    বহুমুখী জ্ঞান হাসিলের জন্যে একসাথে অসংখ্য বিষয় ভুতের মত জেকে বসে শিশু গুলোর মাথায়। একসাথে এতগুলো বিষয়ের বই ব্যাগে বহন করাটা পর্যন্ত তাদের জন্যে তখন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে! কিছু একটা শেখার থেকে শ্রেণি তে প্রথম হওয়া, ভাল নম্বর করা- এসবই বেশি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। সেজন্যেই তারা নতুন কিছু শেখার মধ্যে যে আনন্দ, তা থেকে বঞ্চিত হয়।

    একটু জরিপ করলেই হয়ত জানা যেত শতকরা কতজন শিক্ষার্থী মনের আনন্দ নিয়ে পাঠগ্রহণ করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে যায়। তুলনামূলক নির্ভুল জরিপ হলে হয়ত শতকরা ২০-৩০ ভাগও পাওয়া যাবে না এই তালিকায়। তার অর্থ হল শুরু থেকেই জ্ঞানার্জনের প্রতি প্রবল একটা বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হচ্ছে এই প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেই।

    এখানে যদিও সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়েছে তবুও নোট গাইড মুখস্থের প্রবণতা এতটুকু দুর হয়নি। শিক্ষক মণ্ডলী মুখে সৃজনশীলতার কথা বলে আসলেও নম্বর দেবার সময় ওই নোট গাইড মুখস্থকারী কেই নম্বর দেন বেশি।

    কারন, একটা ছোট্ট শিশুর আধো আধো শব্দচয়ন তার নিকট নম্বর প্রাপ্তির জন্যে ততটা দাবি রাখেনা যতটা রাখে গাইড লেখক উচ্চশিক্ষিতের শক্ত শক্ত শব্দের বাক্যগুলো। সেইসকল জটিল শব্দগুলোর মর্মোপলদ্ধির বয়স যে বাচ্চাটির এখনো হয়নি- এ বোধোদয়টুকু একজন বর্ষীয়ান শিক্ষকের মাথায় কেন জানি কাজ করে না। শিক্ষার্থী একটা সময় এই সব পড়াশোনাকে পাশ করার মন্ত্র হিসেবে জপতে থাকে।

    একটা পাঠ নিজের মত করে বুঝে সেই ভাবে উত্তর দেবার যে সহজাত ক্ষমতা ছিল তার মধ্যে, সেটা নষ্ট হয়ে যায়। বারংবার যখন শিশুর স্বকীয়তা উপেক্ষিত হয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের দ্বারা, তখন হয় সে ইচ্ছের বিরুদ্ধে বই গলাধঃকরণ আরম্ভ করে নতুবা কোনরকমে পাশ করে বিদ্যালয়ে টিকে থাকে বাবা মায়ের বকুনির ভয়ে।

    এই যে মুখস্থ বিদ্যার মত একটা ভয়ানক অভ্যাসকে যারা লালন-পালন করছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বসে, এ থেকে জাতিকে আসলেই তারা কী বিশেষ উপকার করার চিন্তা করছেন? ভ্রুণ হত্যা, শিশু হত্যার মতই প্রতিভা হত্যা কেও কেন অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে না এখানে? আমার প্রশ্ন এখানেই।

    সবাইকে সবার মত করে বেড়ে উঠতে না দিয়ে যদি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়, যদি অন্য কাওকে হুবহু নকল করার জন্যে অনুপ্রাণিত করা হয়, তাহলে সেখানে নতুনত্ব আসবে কী করে? কীভাবে সেখানে নবজ্ঞানের গোড়াপত্তন হবে? কীভাবে সেই জাতি গোটা বিশ্বের কাছে নিজেদের অবস্থানকে অনন্য উচ্চতায় সমাসীন করে দেখাবে?

    এখানে তো তাদের কে কেবল অনুকরন, অনুসরন এবং নকল করার শিক্ষাই দেয়া হচ্ছে। অনেকেই বলেন যে মুখস্থের দরকার আছে। যুক্তি হিসেবে বিভিন্ন তথ্য -উপাত্তের কথা বলেন, যেগুলো নিজের মত করে লেখার সুযোগ নেই। ক্ষেত্রবিশেষে কিছু তথ্য মনে রাখার উপযোগিতা কে অস্বীকার করার অবকাশ নেই।

    তবে আমার বুঝে আসে না, কাজে লাগেনা এরকম জটিল জটিল তথ্য-উপাত্ত মুখস্থ করলে কী বিশেষ লাভ কিংবা না করলে কী বিশেষ ক্ষতি? যেগুলো প্রয়োজন হয় বাস্তব জীবনে সেই তথ্যগুলো আমাদের স্মৃতিতে সব সময় থাকে। কিন্তু যেটার বাস্তবিক কোন প্রয়োগ নেই, কেবল পরীক্ষায় বসার জন্যে প্রয়োজন হয় – তা কেন মুখস্থ করতে হবে? আর মুখস্ত করার পরে আদৌ কী তা মনে থাকে পরে?

    আপনি বাংলাদেশের চিনিকল, পাটকল, পোশাক কারখানা – কার বাৎসরিক উৎপাদন কত ইত্যাদি তথ্যগুলো সমাজ বিজ্ঞানে মুখস্থ করে এসেছেন দেশের গুরুত্ব পূর্ণ তথ্য বিবেচনা করে, এই যুক্তিতে। সেই আপনিই কিন্তু আইটি খাতে বাংলাদেশের কত বিনিয়োগ, শেয়ারবাজার কী জিনিস, রেমিট্যান্স জিডিপি কাকে বলে এইসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানেন না।

    আপনার না জানাটা মোটেও দোষের কিছু না খুবই স্বাভাবিক, আমি নিজেও জানি না এসব উত্তর। কিন্তু আমি বোঝাতে চাচ্ছি যে, যেই যুক্তিতে আপনি পাটকল-চিনিকল মুখস্থ করে গেলেন সেই একই যুক্তিতে আরো অনেক তথ্যই আপনার মুখস্থ করা উচিত ছিল।

    কিন্তু আপনি সেগুলো কে এড়িয়ে গেছেন। যদি প্রশ্ন করি কেন? তবে নিঃসন্দেহে উত্তর হবে পরীক্ষার সিলেবাসে ছিলনা তাই। আসলে যেসকল কঠিন কঠিন গবেষণা লদ্ধ তথ্য উপাত্ত আছে তার সংখ্যা অগনিত, হিসাবের বাইরে। এর মধ্যে থেকে যেটা যেটা ব্যক্তির ব্যবহারিক জীবনে দরকার পড়ে সেটা ব্যক্তিমাত্রই সবার মনে থাকে।

    সেক্ষেত্রে অনেক কঠিন কঠিন তথ্য ও বারংবার কাজে লাগার ফলে মস্তিস্ক সেটাকে আস্তে আস্তে স্থায়ী ভাবে ধারণ করে নেয়। উদাহরণ হিসেবে আপনার এগারো সংখ্যার মোবাই নম্বরের কথাই ভাবুন।

    আপনার নিজের নম্বরটা কিন্তু আপনি ভোলেন না যদিও অন্য কারো অপরিচিত নম্বর এখন মুখস্ত করলেও কাল সেটা আর মনে পড়ে না। এটাই স্বাভাবিক! আমাদের মস্তিষ্কটা একটা জৈব মেশিন, এটা কোন স্বয়ংক্রিয় ডেটা সেন্টার না যে সংরক্ষন করলেই যখন তখন সেটা আপনি বের করে আনতে পারবেন।

    যেসব তথ্য মুখস্থ করলেও তেমন কোন কাজে আসে না, আমরা সেগুলো স্বাভাবিক ভাবেই ভুলে যাই। আমার নিজের শেখা বেশিরভাগ তথ্যই এখন আর মনে নেই। শুধুমাত্র যেগুলো প্রয়োজনের সেগুলোই কেবল মনে পড়ে।

    তাহলে বাকী সব কেন শিখলাম এত কষ্ট করে এত কর্মঘন্টা ব্যায় করে? আমারও একই উত্তর। পরীক্ষার সিলেবাসে ছিল তাই। তাহলে পরীক্ষার সিলেবাসে কেন এমন এমন পাঠ রাখতে হবে যার প্রয়োগ ব্যবহারিক জীবনে থাকে না?

    এই ব্যাপারগুলো নিয়ে আরো একটু গভীর ভাবে ভাবা দরকার। এজন্যেই শিক্ষাকে জীবনমুখী করতে হবে। যেটুকু তথ্য যেই বয়সের জন্যে প্রযোজ্য কেবল সেটুকুই থাক না! এত বেশি ব্যস্ততার কি দরকার?

    সময় হলে মানুষের আপনা থেকেই অনেক কিছু শিখে নেয়ার ক্ষমতা তৈরি হয়, সেই শেখার স্বাধীনতা টুকু দেয়া হোক অন্তত! তাতেই জাতির জন্যে সর্বাঙ্গীন মঙ্গল হবে বলে আশা করি, তাতেই ফলপ্রসূ হবে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার মত মহৎ উদ্যোগ ।

    লেখক- শিক্ষার্থী, পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ, যবিপ্রবি

    Most Popular

    আশাশুনির তুয়ারডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এসএমসির সভা

    আহসান উল্লাহ বাবলু সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধিঃ আশাশুনির তুয়ারডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এসএমসি'র সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার সকালে তুয়ারডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত...

    চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে পূজা মন্ডপ পরিদর্শনে অতিরিক্ত ডিআইজি।

    সুমন পল্লব, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলা পূজা মন্ডপ পরিদর্শনে করেন চট্টগ্রাম রেন্জের পুলিশে অতিরিক্ত ডিআইজি মোঃজাকির হেসেন খাঁন । শনিবার ২৪অক্টোবর বিকেলে উপজেলা...

    গলায় ফাঁস দিয়ে এক শ্রমিকের আত্মহত্যা

    সুলতান আল একরাম,ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধিঃ ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলায় সলেমানপুরে শ্রী সুজন কুমার (৩৫) নামে এক শ্রমিকের গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যর ঘটনা ঘটেছে। (২৪ অক্টোবর) শনিবার...

    সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন উদ্বোধন করেন এমপি রবি

    আহসান উল্লাহ বাবলু সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধিঃ ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। শনিবার (২৪...