More
    Home কলমেই মুক্তি প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে

    প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে

    মোঃ আকিব ফেরদৌস : আলোচনার বিষয়বস্তু দেখে হয়তো অনেকেরই মনে হবে এটাতো অনেক কমন একটা বিষয়। নিত্যনৈমিত্তিক সমস্যা। এ আর নতুন কি? অনেকদিন ধরেই তো শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নানারকম অনিয়ম অভিযোগ লেগেই আছে। হ্যাঁ শিক্ষাব্যবস্থার অনেক অভিযোগ নিয়েই আমরা গলা ফাটাই আলোচনা করি।

    কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে আলাদাভাবে আমরা কতটুক ভাবি? প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা কথাটা শুনতে পরিচিত লাগলেও এই বিষয়বস্তু নিয়ে আমরা খুব বেশি আলোচনা করি বলে মনে হয় না। সব সময় এই বিষয়টা নিয়ে কথা বলা হয়না, আর এখন যেহেতু সুযোগ পাওয়া গেল তাই সরাসরি প্রতিবন্ধকতার ভেতরে ঢোকার আগে কিছু গোড়ার কথা বলে নেয়া প্রয়োজন।

    সারাবিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থাই আজ পাশ্চাত্য ধাঁচে গড়ে উঠেছে। পৃথিবীর সব জায়গায় শিক্ষার কাঠামো কিছুটা একইরকম। তবে ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, যে সময়ে এই পাশ্চাত্য সভ্যতা ঠিকমতো মাথা তুলে দাড়াতে পারেনি তারও বহু বহু আগে থেকেই আমাদের এই উপমহাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত সুন্দর এবং নিয়মতান্ত্রিক ভাবে পরিচালিত হতো এবং আমার মতে সেই আদি যুগই প্রাথমিক শিক্ষার স্বর্ণযুগ ছিল। একথা বলার পেছনে কারণটা খুব সংক্ষেপে একটু বলেই মূল আলোচনায় চলে যাব।

    সময় এবং অবস্থার ওপর ভিত্তি করে আমাদের দেশের অথবা এই উপমহাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার পাঁচটা যুগ দেখা যায়- প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ, উপনিবেশিক যুগ, ৪৭ পরবর্তী সময় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সময়কাল। প্রাচীন যুগ এবং মধ্যযুগের শিক্ষা ব্যবস্থার অবকাঠামো গড়ে উঠেছিল আমাদের নিজস্ব মৌলিক চিন্তাধারার মাধ্যমে। এবং এই দুই সময়ে আমরা দেখতে পাই বৈদিক শিক্ষা, ব্রাহ্মণ্য শিক্ষা, বৌদ্ধ শিক্ষা এবং মুসলিম শিক্ষা। উল্লেখিত প্রত্যেকটি শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হতো। এবং এই সময়ে প্রাথমিক শিক্ষার কাঠামোর বিষয়ে ব্যাপক বৈজ্ঞানিক গবেষণাও দেখা যায়। যা পরবর্তীতে আর কখনো এই উপমহাদেশে নিজেদের চিন্তা-ধারার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

    প্রাচীন যুগ এবং মধ্যযুগকে প্রাথমিক শিক্ষার স্বর্ণযুগ বলার কারণ, এসময় একজন ছাত্রকে প্রথমে শেখানো হতো আত্মার উন্নতি সাধন, সাধনা, চিন্তা, এবং আত্মসংযম। অর্থাৎ তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হতো একজন মানুষের মনুষ্যত্বের এবং মনস্তাত্ত্বিক মৌলিক দিকগুলোর সাথে যার দ্বারা সে প্রথমেই এটা জেনে যায় মানুষ হিসেবে জন্ম নিয়ে তার দায়িত্ব, কর্তব্য ও দায়বদ্ধতা কি কি।

    এরপর এই উপমহাদেশে শুরু হয় উপনিবেশিক যুগ যার মাধ্যমে এদেশে মিশনারি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন শুরু হয়। এবং এরই মধ্য দিয়ে গোড়াপত্তন ঘটে পাশ্চাত্য শিক্ষার। আমরা ধীরে ধীরে নতুন একটি ধারার শিক্ষায় নিজেদেরকে অভ্যস্ত করে ফেলি যে ধারাটি আজও আমাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। উপনিবেশিক শাসনামলে এদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে অসংখ্য গবেষণা এবং সময়োপযোগী উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল যার কিছু কিছু বাস্তবায়িত হয় এবং কিছু কিছু সময়ের সাথে হারিয়ে যায়।

    এদেশের মানুষ ধীরে ধীরে বিশ্বমানের শিক্ষায় শিক্ষিত হতে শুরু করে। তবে ৪৭ পরবর্তী সময় হতে স্বাধীন বাংলাদেশ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কে তেমন কোনো বিশেষ উদ্যোগ বা পদক্ষেপ দেখা যায় না। উল্লেখযোগ্য হিসেবে ধরা যায় ১৯৫২ সাল থেকে প্রাথমিক বৃত্তি ব্যবস্থার সূচনা। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে আবার নতুন করে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। ১৯৭২ এর সংবিধানে শিক্ষা কে মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং একইসাথে শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। এরপর অসংখ্য পদক্ষেপ নিলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে গুরুত্ব পায়নি শিক্ষাখাত ।

    এখন দেখা যাক এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিবন্ধকতার জায়গা গুলো কি কি। একটা সময় ছিল যখন এদেশের মানুষের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়াটাই সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল। তবে সুখের বিষয় হলো আমরা বর্তমানে সেই প্রতিবন্ধকতা অনেকাংশেই কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। দেশের সকল স্তরের মানুষের জন্যই প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ করে দেয়া সম্ভব হয়েছে এবং গ্রহণযোগ্যতাও বৃদ্ধি পেয়েছে তবে পরিমাণগত ভাবে বৃদ্ধি পেলেও সেই শিক্ষার গুণগত মান আসলেই কতটুক বৃদ্ধি পেল সেটাই আমরা এবার একটু আলোচনা করে দেখি। আলোচনার খাতিরে আমি আমার পাঠকদের কাছে কিছু বস্তু নির্ভর এবং যৌক্তিক প্রশ্ন তুলে ধরবো যার উত্তর কিছুটা আমি নিজেও দেয়ার চেষ্টা করছি এবং পাঠকদের কাছে অনুরোধ, সেই প্রশ্নের উত্তরগুলো আপনারাও নিজ উদ্যোগে চিন্তাভাবনা করে বের করার চেষ্টা করবেন।

    ১. একজন শিশুকে আমরা কতটুকু ভাবতে শেখাচ্ছি?

    কারণ শিশুটি যখন প্রাপ্তবয়স্ক হবে তখন সে একটি পূর্ণাঙ্গ মানসিক অবকাঠামো লাভ করবে যা পুরোপুরি তার প্রাথমিক শিক্ষার ওপরেই নির্ভরশীল। শৈশবে কারোরই উপযুক্ত চিন্তার মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকেনা। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই ক্ষমতা ধীরে ধীরে তৈরী হয়। এবং সেটা কতটুকু তৈরি হবে অথবা ভবিষ্যতে সে কিভাবে চিন্তা-ভাবনা করবে, কেমন চিন্তাধারার মানুষ হবে সেটা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে তার শৈশবের প্রাথমিক শিক্ষার ওপরে ।

    ২. সে তার নাগরিকত্ব পরিচিতি কতটুক শিখছে?

    আমাদের চারপাশের মানুষগুলোর মধ্যে একটা অংশকে দেখা যায় তারা আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভোগে। এই ব্যাপারটা প্রকাশ পায় তাদের কাজকর্ম কথাবার্তা দিয়ে। কারণ এরা এদের নাগরিকত্ব টাকে বিচার করে ধর্ম অথবা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। এই হতাশাজনক পরিস্থিতিটা যাতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে না যায় তার জন্য প্রয়োজন সঠিক এবং পরিকল্পিতভাবে একটি শিশুকে তার নাগরিকত্ব সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেওয়া। সে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্ব নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে তাকে সেটি অনুধাবন করতে দিতে হবে। এক কথায় বলতে গেলে তার ভেতরে দেশাত্মবোধ তৈরি হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে ।

    ৩. শিশুমনের কল্পনার জগতটা কি উন্মুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে ?

    কেউ মানুষ হিসেবে জন্ম গ্রহণের ফলে যে কয়টি মৌলিক বৈশিষ্ট্য লাভ করে যা আর কোন প্রাণীর মধ্যে দেখা যায় না তার মধ্যে একটি হলো কল্পনা করার ক্ষমতা। একটা মানুষ যত বেশি প্রাপ্তবয়স্ক হতে থাকে সে ততো বেশি বাস্তবমুখী হয়ে ওঠে। ‌ ফলে তার কল্পনার জগত টা আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসতে থাকে। কিন্তু একটি শিশুর কল্পনা জগতের পরিধি অনেক ব্যাপক আকারের হয়। যা তার সৃজনশীলতাকে আরো বেশি শাণিত করে তোলে। আমরা আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে শিশুর এই কল্পনার জগৎকে কতটুকু উন্মুক্ত হতে দিচ্ছি বা আদৌ দিচ্ছি কিনা।

    ৪. আত্মবিশ্বাস তৈরীর সুযোগ পাচ্ছে কি ?

    নিজের বুদ্ধি, মেধা, কৌশল কিংবা অভিজ্ঞতার ওপর আস্থা রাখা টাই হলো আত্মবিশ্বাস। আর শৈশবে সেই আত্মবিশ্বাস তৈরীর ক্ষেত্রে বড় একটি প্রভাবক হলো আশেপাশের মানুষের অনুপ্রেরণা। কিন্তু আমার মনে হয় এখনকার প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থার ফলে এই অনুপ্রেরণার জায়গাটা কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে গেছে। কাগজের ওপর লেখা ফলাফলের ভেতরেই অনুপ্রেরণা আটকা পড়ে আছে। যার কারণে আত্মবিশ্বাসের অভাবটা  আত্মনির্ভর হতেও বাধা দিচ্ছে।

    ৫. শুধু কি সুশিক্ষাই দিচ্ছি নাকি স্বশিক্ষিত হতেও শেখাচ্ছি ?

    মনীষীদের বুলি আওড়াতে আওড়াতে এ কথাটা আমাদের মুখস্থ যে স্বশিক্ষিত জনই সুশিক্ষিত। ‌ কিন্তু মুখস্ত হয়ে আর লাভ কি যদি তা প্রয়োগই না হয়। ছেলে মেয়ে গুলোকে আমরা সুশিক্ষায় শিক্ষিত করছি ঠিকই কিন্তু কতটুক স্বশিক্ষিত হতে শেখাচ্ছি? নিজের কৌতূহলের পিপাসা মেটানোর জন্য কয়জন নিজ তাগিদে জ্ঞান আহরণ করে ? তাও যদি হয় সিলেবাস বহির্ভূত জ্ঞান ? আমার তো মনে হয় তখন সংখ্যাটা শূন্যের কোটায় দাঁড়াবে।

    ৬. অভিজ্ঞতাকে কৌশলে রূপ দেওয়া কি শিখছে ?

    এই পয়েন্টটা নিজের উদাহরণ দিয়েই বলি। তখন নতুন নতুন মানিব্যাগ ব্যবহার করা শিখেছি। দুই টাকা দশ টাকা যা পেতাম মানিব্যাগে রাখতাম। প্যান্টের পেছোন পকেটে মানি ব্যাগটা রাখতে ভালোই লাগতো। একদিন ভুল করে টেবিলের ড্রয়ারে মানিব্যাগ রেখে বাইরে চলে এসেছি। রিক্সা ভাড়া দিতে গিয়ে পড়লাম বিপদে। সেই প্রথম সেই শেষ। আর কখনো মানিব্যাগ নিতে ভুলিনি। পারতপক্ষে মানিব্যাগটা প্যান্টের পকেট থেকে বের করতাম না। একটা তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়তো আমাকে বেশ কিছু কৌশল উদ্ভাবন করতে সহায়তা করেছিল। ঠিক একই ঘটনা জীবনের প্রত্যেকটা স্তরে স্তরে ঘটে। একজন শিক্ষার্থী যদি তার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন কৌশল উদ্ভাবন করতে না পারে তাহলে তার উদ্ভাবনী ক্ষমতা কোনভাবেই বিকাশ লাভ করবে না।

    ৭. অনর্থক প্রতিযোগিতা মেধার সংজ্ঞাটি পাল্টে দিচ্ছে নাতো ?

    ডক্টর এপিজে আবদুল কালাম বলেছিলেন,”মেধাবী হওয়াটা গর্বের কিছুনা, শয়তান ও মেধাবী হয়।” অর্থাৎ আমি প্রকৃত মেধাবী কিনা সেটা নির্ভর করছে আমার মেধার প্রয়োগের উপরে। কিন্তু আমরা এখন  মেধার বিচার কোন সূচকে করছি সেটাও কিন্তু দেখার বিষয়। পরীক্ষার ফলাফলে গ্রেডিং এর পাশে যোগ চিহ্ন থাকলেই সে মেধাবী হয়ে যাচ্ছে। কিংবা মেধাবী বিচার হচ্ছে এডমিশনের ফলাফলের উপর। হাস্যকর হলেও সত্য, এখন আর ক্লাস থ্রির বাচ্চার এডমিশন এবং ইউনিভার্সিটি এডমিশন এর ভেতরে কোনো পার্থক্য নেই।

    ৮. জ্ঞানটা কি কৌতুহল হিসেবে দেওয়া হচ্ছে নাকি বোঝা ?

    একজন শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায় শিক্ষকের উপস্থাপন এবং আচরণের ওপর ভিত্তি করে। এখন দেখার বিষয় শিক্ষক আদৌ শিক্ষার্থীর মনে জ্ঞান গ্রহণের জন্য কৌতূহলের জায়গাটা তৈরি করে দিতে পারছে কিনা।

    ৯. শিক্ষার ব্যপ্তি কতদূর?

    যে শিক্ষা বইয়ের পাতা পর্যন্ত শেষ হয় অথচ জীবনমুখী হয় না সে শিক্ষার কোন দাম নেই। সেই জ্ঞানের দৌড় বড়জোর পরীক্ষার রেজাল্ট পর্যন্ত। ছোট সন্তানকে আমরা রিকশায় চড়িয়ে বলি, ” যদি ভাল করে লেখাপড়া না করো তাহলে বড় হয়ে এরকম রিকশা চালাতে হবে।” তারপর বাসায় গিয়ে পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য নীতি কথা গুলোর ভাব সম্প্রসারণ মুখস্ত করাই। এরকম নীতিকথা পরীক্ষায় ভালো নাম্বার আনতে পারবে কিন্তু সেই রিক্সাওয়ালাকে সম্মান দেওয়া শেখাবে না। জীবনে সফলতা এবং সার্থকতা শব্দদুটো শিখবে ঠিকই কিন্তু শব্দ দুইটার অর্থ কখনো বুঝবে না।

    ১০. বয়স এবং মানসিক বিকাশ অনুযায়ী শিক্ষার কাঠামো তৈরি হচ্ছে কি ?

    ইতিহাস থেকে জানা যায় আমাদের এই উপমহাদেশে বৌদ্ধ শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি নিয়ম ছিল। নিয়মটি হল একজন সন্তান আট বছর বয়সে প্রবজ্যা লাভ করে। অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের জন্য সে ঘর ছেড়ে বের হয়। আট বছর পূর্ণ হওয়ার আগে সে ঘরোয়া ভাবে শিক্ষা লাভ করে। এই কথাটি বলার কারণ হলো, এখন আমরা অতি কম বয়সে শিশুদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিচ্ছি। অথচ তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কি সেটা বোঝার মত মানসিক বিকাশ ঘটেছে কিনা তা ভেবে দেখি না। এমনকি এদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষা অবকাঠামো তৈরি নিয়ে গবেষণাও হয় না।

    ১১. পরাবিদ্যা চর্চা করছি নাকি অপরাবিদ্যা চর্চা হচ্ছে এখনো ?

    প্রাচীনকালের বিদ্যা দুই ধরনের ছিল। একটি হল অর্থ না বুঝে কিংবা অনুধাবন না করে শুধুমাত্র মুখস্ত করে যাওয়া। এটিকে বলা হত অপরাবিদ্যা। অন্যদিকে জ্ঞান এর অর্থ বুঝে অনুধাবন করে শিক্ষালাভ করাকে বলা হতো পরাবিদ্যা। একজন শিক্ষক বা ছাত্র নিজেই বেছে নিতে পারত সে কোন প্রকার বিদ্যা লাভ করবে। কিন্তু এখনকার ব্যাপারটা বড়ই ভয়ংকর। বেশিরভাগ স্থানেই এখনো পরা বিদ্যার নাম করে অপরা বিদ্যা চর্চা হচ্ছে। ফলে আমরা এটাও ঠিক ভাবে ধরতে পারছিনা যে শিশুদেরকে আসলেই কোনটা শেখানো হচ্ছে । বৌদ্ধ সম্প্রদায় বলতো অজ্ঞতা একটি পাপ। শিক্ষা সেই পাপ মোচন করে।বর্তমানে একজন শিক্ষিত মানুষ এটাই অনুধাবন করতে পারছে না যে সে কী শিখল। অর্থাৎ সে শিক্ষিত অজ্ঞ। অজ্ঞতা যদি পাপ হয় তাহলে এটা হবে মহাপাপ।

    ১২. সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আমরা কতটুক ভাবি ?

    ইদানিং বিভিন্ন বেসরকারি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান  সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন। এটা একটা আশার আলো এবং সুখবর। কিন্তু সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষা ব্যবস্থা গুলো কি সরকারের নজরদারিতে আছে ? নাকি এখানেও দায়সারা ভাব ? বেসরকারী প্রতিষ্ঠান গুলোর উপরেই কি শুধুমাত্র এদের শিক্ষার দায়ভার? সরকারের কোন দায় নেই? যদি থেকে থাকে তাহলে অবশ্যই অন্যান্য শিক্ষা কাঠামোর পাশাপাশি এদের জন্যও বিশেষ শিক্ষা খাত তৈরির ব্যাপারে গবেষণা প্রয়োজন।

    ১৩. মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমরা আলাদা ভাবি কেন ?

    একদম শুরু থেকেই আমাদের ভেতরে একটি প্রবণতা কাজ করে যে, মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা টা মূলধারার শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কখনোই কোনোভাবেই এটা ভাবা উচিত নয়। এ ধরনের চিন্তাধারার কারণেই আজ মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা আধুনিকায়ন কিংবা উন্নয়নের ব্যাপারে বিশেষ কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।

    ১৪. সৃজনশীল পদ্ধতি কি সত্যিই সৃজনশীলতা বাড়াতে পেরেছে ?

    সৃজনশীল পদ্ধতির সাথে আমি প্রথম পরিচিত হই অষ্টম শ্রেণীতে। একদম নতুন একটি পরীক্ষা পদ্ধতি বুঝতে কিছুটা সময় লেগেছে। শেষ পর্যন্ত যখন সৃজনশীল পদ্ধতির প্রকৃত উদ্দেশ্য টা বুঝলাম তখন কিছুটা বিচলিত হতেই হল। কারণ যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই পদ্ধতির প্রচলন চালু হয়, সে উদ্দেশ্য কোনভাবেই পুরোপুরি সফল হয়নি। সৃজনশীল পদ্ধতি ছাত্র-ছাত্রীদের সৃজনশীলতা কতটুক বাড়াতে পেরেছে তাতে আমার সন্দেহ রয়েছে । এবং এই সন্দেহের পিছনে প্রধান কারণ শিক্ষকরা নিজেই এই পদ্ধতিটা কে বুঝে উঠতে পারেননি। আজও কোন না কোনভাবে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সেই পুরনো প্রবণতার ছায়া দেখা যাচ্ছে। কিছু বাঁধাধরা নিয়মের ভিতরে সৃজনশীলকে রাখার চেষ্টা করছে তারা। অথচ সৃজনশীলতার যে কোন নিয়ম নীতি নেই এটাই তাদেরকে বোঝানো যাচ্ছে না । তারা পড়ছে ঠিকই। হয়তো বুঝতে পারছে। কিন্তু কি পড়লো সেটা নিয়ে ভাবছে না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন। “আপনি ভুল বলেছিলেন, দেখে যান আজ আমার বাঙালি মানুষ হয়েছে”। তাহলে কেন আমাদের ছেলেমেয়েগুলো একজন লেখক এর লেখায় তার নিজের মত প্রকাশ করতে পারছে না? কেন তারা একজন বড় লেখক এর লেখা নিয়ে গঠনমূলক কথা বলতে পারেনা? কারণ তারা যা পড়ছে তা বিশ্লেষণ করতে পারছে না।

    ১৫. শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কতটুকু বৈজ্ঞানিক ভাবে হচ্ছে ?

    প্রাথমিক শিক্ষায় সব প্রতিবন্ধকতা কেটে যাবে যদি আমরা সঠিক প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রকৃত শিক্ষক তৈরি করে দিতে পারি। এতক্ষন যত গুলো সমস্যা নিয়ে আমরা জানলাম সবগুলোর একটা কমন সমাধান হলো শিক্ষকের প্রশিক্ষণ। কারণ একজন ভালো শিক্ষক পারে একটি ভালো নাগরিক তৈরি করে দিতে। এবং একজন ভালো শিক্ষক তখনই হওয়া সম্ভব যখন সে ছাত্রের মানসিক অবস্থা অনুধাবন করার ক্ষমতা অর্জন করতে পারবে। যার কারণে বলা যায় প্রকৃত শিক্ষা গুরু সেই যে অর্ধেক শিক্ষক এবং অর্ধেক মনস্তাত্ত্বিকবিদ। কিভাবে একজন শিক্ষার্থীর সাইকোলজি বোঝা যায় সেটা অবশ্যই আমাদের প্রাথমিক শিক্ষকদের কে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিতে হবে।

    আলোচনার শেষ পর্যায়ে এসে একান্তই ব্যক্তিগত দুটি কথা বলে শেষ করবো। কোন দেশ কিভাবে পড়াচ্ছে সেসব উদাহরণ না টেনে নিজেদের গবেষণা এবং নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী দেশের প্রাথমিকশিক্ষা ব্যবস্থাকে গড়ে তুলতে হবে। বাইরের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা অনুসরণ কিংবা অনুকরণ না করে নিজেদের গবেষণা অনুযায়ী শিক্ষার অবকাঠামো বানাতে হবে। দুঃখের বিষয় হলেও এটা সত্য, আমার কেন জানি মনে হয় আমরা আমাদের শিক্ষাখাতের উচ্চতর স্তর গুলো নিয়ে যতটা চিন্তা করি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ঠিক ততটাই উদাসীন।

    লেখক : শিক্ষার্থী, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

    Most Popular

    শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ করেছেন, হবিরবাড়ীতে সোহেল খান

    আরিফ রববানী, ময়মনসিংহ : ময়মনসিংহ জেলা বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের সাধারন সম্পাদক, ভালুকা উপজেলার সাবেক ছাত্রনেতা, হবিরবাড়ী ইউনিয়ন কৃষকলীগের সাবেক সভাপতি, ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়ন...

    ফুলবাড়ীতে জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপে ৩ হাজার বিঘা জমির জলাবন্ধতা নিরসন

    মেহেদী হাসান উজ্জ¦ল, ফুলবাড়ী,দিনাজপুর প্রতিনিধি: দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার খয়েরবাড়ী ও দৌলতপুর ইউনিয়নের প্রায় ৩ হাজার বিঘা জমিতে দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা নিরসনের ব্যবস্থা করেছেন দিনাজপুরের...

    চাঁদপুর পৌরসভার নবনির্বাচিত পরিষদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

    মোঃনজরুল ইসলাম, চাঁদপুর প্রতিনিধি : আজ শনিবার(২৪ অক্টোবর) বেলা ১২টায় সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে শপথ বাক্য পাঠ করান চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার এবিএম আজাদ এনডিসি...

    সিংড়ায় মার্সেলের দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য আয়োজন

    রাজু আহমেদ, স্ট্যাফ রিপোর্টার: ‘ফ্রিজ পেতে পারেন ফ্রি তে’- শ্লোগান সামনে রেখে চলছে দেশের অন্যতম শীর্ষ ইলেক্ট্রনিক্স ব্র্যান্ড মার্সেল ডিজিটাল ক্যাম্পেইন সিজন-৮ এর কার্যক্রম। এ...