More
    Home কলমেই মুক্তি নানা সমস্যায় জর্জরিত প্রাথমিক শিক্ষা

    নানা সমস্যায় জর্জরিত প্রাথমিক শিক্ষা

    সাগর কুমার দে : শিক্ষার প্রাথমিক স্তর পরিবার হলে পরের স্তরে ভূমিকা রাখে প্রাথমিক বিদ্যালয়। তবে আমাদের দেশের অধিকাংশ পরিবারের পিতা মাতা স্ব শিক্ষায় শিক্ষিত নয়। এজন্য শিক্ষার প্রসারে প্রধান ভূমিকা পালন করে প্রাথমিক বিদ্যালয়।

    তবে প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণের কতটা এগিয়ে বাংলাদেশ? আমাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিবন্ধকতার মধ্যে অন্যতম হলো দারিদ্র্যতা, অভিভাবকদের অসচেতনতা, অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শিক্ষকের অভাব,সুষ্ঠু পরিবেশ, শিক্ষার মান উন্নয়নে, শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়ন, স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির দুর্বলতা, নৈতিক শিক্ষার অভাব সহ নানা ধরনের সমস্যায় জর্জরিত আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা।

    জাতিসংঘের শিক্ষা সংক্রান্ত এক বিশেষ অধিবেশনে ২০১৪ সালে  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রয়োজন উচ্চ মানের শিক্ষক। তিনি বিশ্বের সকল নেতৃবৃন্দের প্রতি বলেছিলেন যে অস্ত্র নয় শিক্ষার বিনিয়োগ করুন।

    তবে তিনি সেই কথা রেখেছেন।  শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ, প্রাথমিক স্কুল সরকারি করণ, ছাত্র ছাত্রীদের উপবৃত্তি, বিনামূল্যে বই বিতরণ সহ নানা কার্যক্রম পরিলক্ষিত।

    তবে দেশের শিক্ষা কাঠামোয় নানা ধরনের সমস্যা থাকায় এখনো প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণের সম্ভব হয়নি বলে মনে করি। আমাদের দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা শহর কেন্দ্রীয় হওয়ায় গ্রামীণ জনপদের ছাত্র – ছাত্রীরা এখনো পিছিয়ে। তবে এক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা দারিদ্র্যতা। সরকার উপবৃত্তি প্রদান করলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অনেক কম। শুধু সরকার নয়, বিভিন্ন ব্যাংক, এনজিও সহ নানা প্রতিষ্ঠান শিক্ষা বৃত্তি চালু করলেও অনেক পরিবার আছে যারা সন্তানের খাতা কলম পর্যন্ত কিনে দিতে পারে না। এজন্য যখনই আমরা পরীক্ষার ফল প্রকাশ দেখি তখনই সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখে পড়ে চা বিক্রি করে কেউ ভালো রেজাল্ট করেছে কেউ বা সারাদিন শ্রম দিয়ে রাতে অল্প পড়েই ভালো রেজাল্ট করেছে।

    শুধু দারিদ্র্যতাই শেষ নয় একে একে চেষ্টা করবো প্রাথমিক শিক্ষায় যে প্রতিবন্ধকতা সেগুলো তুলে ধরার-

    অভিভাবকদের অসচেতনতা :

    দেশের প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ বাবা -মা অশিক্ষিত হওয়ায় ছেলে মেয়েদের পিছনে কম সময় দেয়। তখন সেই ছেলে -মেয়ে শুধু বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার বলে বেড়ে ওঠে। আবার অনেক পরিবারের বাবা মা আছেন যারা আধুনিক যুগে ছেলে মেয়ে কে পড়তে বসিয়ে ভারতীয় সিরিয়াল, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো সোচ্চার। তাহলে পরিবারে শিক্ষক থেকেও তারা সেই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। শুধু এখানেই শেষ কি? একজন শিশু নিয়মিত স্কুলে পড়া দেয় , ঠিক মতো স্কুলে যায়, পরীক্ষার খাতা দেখা এগুলো সাধারণত শিক্ষিত – অশিক্ষিত সকলেই পারে মূল্যায়ন করতে। শিশুর শিক্ষায় আসক্তি, শিক্ষার ভিত্তি যেখান থেকে বেড়ে উঠবে সেখানেই কিন্তু গলদ দেখতে পাই।

    অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শিক্ষকের অভাব :

    কিছুদিন আগে স্কুল সরকারি করণের জন্য আমরা সরকার কাছে আবেদন এমনকি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকরা মাঠে নেমে আন্দোলন করেছে।  যার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার আধা সরকারি প্রাথমিক স্কুল গুলো সরকারি ঘোষণা করেন। তবে এসব স্কুলে যদি অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শিক্ষক থাকবে তাহলে প্রাথমিক শিক্ষার সময় থেকেই একজন শিশুর গণিত অথবা ইংরেজিতে কেন দূর্বলতা থাকবে?  সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপর বিশ্বাস নেই  বলে শিশুর বেজ তৈরি করতেই অধিকাংশ অভিভাবক কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়ান। তারপর তারা প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি করায়। এখানে প্রশ্ন থাকে যে সরকার তার কাজ ঠিকই করছে আপনি নিজের থেকে কতটা দায়ভার নিয়ে এগিয়ে আসছেন?

    একটা জিনিস শিক্ষকদের মাথায় রাখা উচিত, তারা যে বেতন পান সেটা সাধারণ মানুষের টাকায় অথচ তাদের সন্তানদের বেলায় কেন এই অবহেলা? এখানে সব শিক্ষকের কথা বলছি না, কিছু স্কুল আছে সেখানে তাদের শিক্ষকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বলে সে স্কুল সরকারি হওয়া শর্তেও তারা তাদের সন্তানদের সেই স্কুলে ভর্তি করায় না। এটা শিক্ষক হিসাবে তাদের বড় ব্যর্থতা বলে মনে করি। আমদের অনেক অভিভাবক আছে, যারা স্কুলের শিক্ষকদের উপর নির্ভরশীল। তারাই যদি একটু দায়িত্ব বা তাদের নৈতিকতা থেকে এগিয়ে আসে তাহলে শিক্ষার প্রসারে প্রাথমিক স্তর অনেক এগিয়ে যাবে বলে মনে করি।

    স্কুলে ব্যবস্থাপনা কমিটির দূর্বলতা :

    একটি স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটি যদি শক্তিশালী হয় তাহলে সেই স্কুলের মান উন্নয়নে অগ্রগতি বাড়বে। কিন্তু স্কুল কমিটিতে যথাযথ শিক্ষিত ব্যক্তি দ্বারা গঠিত হয় না বলে আজ প্রাথমিক শিক্ষার এই বেহাল অবস্থা। প্রতি বছর সরকারি স্কুলে বাজেট হয় স্কুল উন্নয়ন, শিক্ষার প্রসারে সহ নানা ধরনের উন্নয়নে। কিন্তু অধিকাংশ স্কুল কমিটিতে রাজনীতি প্রভাবে প্রভাবিত হওয়ায় সেই টাকা যথাযথ খাতে ব্যবহৃত হয় না। স্কুল কমিটি কর্তৃপক্ষের এই দূর্বলতা থাকায় একজন শিক্ষক স্কুল ফাকি বা ঠিক মতো ক্লাস না করলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও তারা অপারগতা প্রকাশ করে। আবার অনেক স্কুল কমিটি আছে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি নয় শিক্ষিত ব্যক্তিদ্বারা কমিটি তৈরি হয় ফলে সেই স্কুলের শিক্ষার মান উন্নয়নে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন।

    শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়ন :

    আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সিলেবাস, বই অনেক বড়। যা ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের অনেক কষ্ট হয়ে পড়ে। মানুষ ছাড়া বড় বড় বই যেটা ছেলে মেয়েদের অনেক কষ্টের ব্যাপার। আবার বছরে দুইবার পরীক্ষা। এখানেও কিছু পরিবর্তন থাকলে সুবিধা হয় বলে মনে করি। একটা জিনিস খেয়াল করে দেখবেন পরীক্ষার সময় ছেলেমেয়েরা পড়ার ভিতর থাকে। সেক্ষেত্রে তাদের সাপ্তাহিক পরীক্ষা নিয়মিত নিলে এবং এই পরীক্ষার মূল্যায়ন করলে তার পড়াশোনার ভিতর থাকবে। অন্যদিকে বড় বড় পরীক্ষার জন্য সিলেবাস ও প্রয়োজন থাকবে। এক্ষেত্রে সিলেবাস উন্মুক্ত করা উচিত। তার মানে এই  আপনি সপ্তাহে যতটুকু সম্ভব  পড়াবেন এবং তার উপর ছেলে – মেয়েদের মূল্যায়ন করবেন। তাহলে তাদের একটা ভালো বেজ তৈরি হবে বলে মনে করি।  আর যখনই আপনি সিলেবাস নিয়ে ভাববেন তখন শিক্ষক তড়িঘড়ি করে সিলেবাস শেষ করে একবারে পরীক্ষা নেবেন। এক্ষেত্রে পরীক্ষার ফলে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। কারণ সকল ছেলে মেয়ে সমান পারে না, একবারে অতিরিক্ত হলে অনেক সময় ভালো ছেলে মেয়েও খারাপ ফল করে অতিরিক্ত চাপের ফলে। এক্ষেত্রে যারা দেশের শিক্ষা কাঠামোয় সংযুক্ত আছেন তারা দৃষ্টি দিলে প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আসবে বলে মনে করি।

    ফ্রী বইয়ের পাশাপাশি খাতা কলম বিতরণ :

    সরকার শিক্ষার প্রসারে শিশু শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণির বই ফ্রী বিতরণ করছে এটাকে সাধুবাদ জানায়। কারণ  সরকার এক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা পালন করে চলেছেন। তবে ফ্রী বই বিতরণের পাশাপাশি সরকার প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ফ্রী খাতা, কলম,ও স্কুল মিল নীতি চালু করলে শিশুরা পড়ালেখার  প্রতি বেশি ঝুকবে। এবং দারিদ্র্যের জন্য শিক্ষা বিমুখীতা দূর হবে বলে মনে করি। যদিও সরকারের উচ্চ মহল ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন ২০২৩ সালের মধ্যে স্কুল মিল নীতি চালু করবে। তবে সেই সাথে ফ্রী বইয়ের পাশাপাশি ফ্রী খাতা কলম চালু করলে শিশুদের বিকাশে অনেক পরিবর্তন হবে। উল্লেখ্য যে সরকার মিল নীতি চালু করতে দেরি করলেও প্রাথমিকের সকল ছেলে মেয়েদের টিফিনে বিস্কুট দিয়ে যাচ্ছে নিয়মিত।

    দারিদ্র্যতা, অভিভাবকদের অসচেতনতা, অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শিক্ষকের অভাব,সুষ্ঠু পরিবেশ, শিক্ষার মান উন্নয়নে, শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়ন, স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির দুর্বলতা, এগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে। এবং বাস্তবে যদি এগুলোর প্রতিফলন ঘটানো যায় তাহলে শিক্ষার প্রসারে প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ সম্ভব বলে মনে করি।

    লেখক : সাগর কুমার দে, কম্পিউটার বিজ্ঞান প্রকৌশল বিভাগশেখ হাসিনা আইসিটি ইন্সটিটিউটবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় 

    Most Popular

    সরকার নির্ধারিত দামে ব্যবসায়ীদের আলু-পেঁয়াজ বিক্রি করা উচিত: কৃষিমন্ত্রী

    ঢাকা, ২৪ অক্টোবর- কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক সরকার নির্ধারিত দামেই ব্যবসায়ীদের আলু-পেঁয়াজ বিক্রি করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, আমরা আলুর দাম কমিয়ে একটা...

    শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ করেছেন, হবিরবাড়ীতে সোহেল খান

    আরিফ রববানী, ময়মনসিংহ : ময়মনসিংহ জেলা বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের সাধারন সম্পাদক, ভালুকা উপজেলার সাবেক ছাত্রনেতা, হবিরবাড়ী ইউনিয়ন কৃষকলীগের সাবেক সভাপতি, ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়ন...

    ফুলবাড়ীতে জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপে ৩ হাজার বিঘা জমির জলাবন্ধতা নিরসন

    মেহেদী হাসান উজ্জ¦ল, ফুলবাড়ী,দিনাজপুর প্রতিনিধি: দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার খয়েরবাড়ী ও দৌলতপুর ইউনিয়নের প্রায় ৩ হাজার বিঘা জমিতে দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা নিরসনের ব্যবস্থা করেছেন দিনাজপুরের...

    চাঁদপুর পৌরসভার নবনির্বাচিত পরিষদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

    মোঃনজরুল ইসলাম, চাঁদপুর প্রতিনিধি : আজ শনিবার(২৪ অক্টোবর) বেলা ১২টায় সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে শপথ বাক্য পাঠ করান চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার এবিএম আজাদ এনডিসি...